Ashraful, The Legend.... আশরাফুল, এক মহা কাব্য।।।

যার ব্যাট হাসলে হাসত পুরো বাংলাদেশ (প্রথম পর্ব) তার আবির্ভাব রূপকথার রাজপুত্রের মত। দেশের ক্রিকেটের প্রথম সুপার স্টার মানা হয় তাকে। যার ব্যাট হাসলে হাসত পুরো বাংলাদেশ । বাংলাদেশ ও পারে এই সাহস টাইগারদের বুকে সঞ্চালন করে দিয়েছিলেন তিনি। অনেক প্রথমের সাক্ষী তিনি। বলছিলাম দেশের ক্রিকেটের এক সময়ের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন মোহাম্মদ আশরাফুলের কথা। প্রায় ১৪ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার অতটা বর্ণাঢ্য নয়। তবে নিজের দিনে তিনি ছিলেন প্রতিপক্ষের জন্য মূর্তিমান আতংক। একা লড়াই শুধু ম্যাচ জেতানোয় তিনি ছিলেন সেরাদের সেরা। নিজের দিনে বিশ্বের যে কোন দলকে আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে আনতেন। এই একটা কারনেই হইত তিনি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর হ্রদয়ে চিরস্থায়ী আসন পেয়েছেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখেন সবার প্রিয় অ্যাশ।অভিষেকটা রঙিন পোশাকে। তবে নিজের জাত চেনাতে তিনি বেছে নিয়েছিলেন সাদা পোশাকের অভিজাত ফরমাটকে। ২০০১ সালে এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নসশিপে ম্যাচ দিয়ে অভিষেক।যেন এলেন, দেখলেন আর জয় করলেন। সে ম্যাচে তিনি যা করেছেন টেস্ট ক্রিকেটের ১৪০ বছরের ইতিহাসে তা করে দেখাতে পারে নি কেউ। চামিন্দা ভাস আর মুরালিধরনদের নাকের জল আর চোখের জল এক করে ছেড়েছিলেন। সেদিন সেই পিচ্চি ছেলেটার বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর ৬১ দিন। ৭ সেপ্টেম্বর কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাবকে সাক্ষী লাল বলের ক্রিকেটে নিজের প্রথম ম্যাচেই করেছিলেন ১১৪ রানের জ্বলমলে ইনিংস। নাম লিখিয়েছেন ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ অভিষেক টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান হিসেবে। চিটাগং এর এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে ভারতের বিপক্ষে সেই ১৫৮ মহাকাব্যিক ইনিংস কি এত সহজে ভোলা যায়। জহির খান, ইরফান পাঠানদের একের পর পর বাউন্ডারি ছারা করে করে মাত্র ১৯৪ বলে করেছিলেন ১৫৮ রান। যেখানে ২৪ চারের সাথে ছিল ৩ ছয়। রূপকথার কার্ডিফ কাব্যের নায়ক তিনি। যে কাব্য রচিত হয়েছিল হাত ধরে। বাংলাদেশ, ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া এই তিন দল নিয়ে চলছিল ন্যাটওয়েস্ট সিরিজ। সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া। পন্টিং, গিলগ্রিস্ট, হেইডেন,ব্রেট লি, ম্যাকগ্রাদের নিয়ে গড়া সে দলকে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের সেরা ওয়ানডে দল বিবেচনা করা হয়। সে দলকে আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে এনেছিলেন আশরাফুল। ১০০ বলে হাঁকিয়েছিলেন ম্যাচ উইনিং সেঞ্চুরি । কার্ডিফের সোফিয়া গার্ডেন যেন সেদিন হয়ে উঠেছিল এক টুকরো বাংলাদেশ। পরের ম্যাচেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে যেন আরও ক্ষুরধার আশরাফুলের উইলো। স্কুপ, পুল আর হুক-শটে দিশেহারা করে দেন ইংলিশ বোলিং লাইন আপ। ফ্লিনটফ, হার্মিসনদের কচুকাটা করেছিলেন সেদিন। তার ৫২ বলে ৯৪ রানের ইনিংসটি যারা দেখেছেন তারা যেন স্বপ্নেই বুদ ছিলেন। অজি বধের পর আশরাফুল শিকার বানিয়েছেন প্রোটিয়াদের। ২০০৭ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপ। ভারতকে হারিয়ে সুপার এইটে বাংলাদেশ। সুপার এইটে ৭ এপ্রিলে গায়ানার প্রভিডেন্স স্টেডিয়ামে প্রতিপক্ষ এবার দক্ষিণ আফ্রিকা। স্মিথ,ক্যালিসদের দক্ষিণ আফ্রিকা তখন র‌্যাঙ্কিং এক নাম্বার দল। কিন্তু নিজের দিনে আশরাফুল ত সব আলো কেড়ে নিবেন এ আর নতুন কি! তার ৮৩ বলে ৮৭ রানের সেই ইনিংসের উপর ভর করেই বাংলাদেশ ম্যাচ জিতেছিল ৬৭ রানে। ২০০৭ এর টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে এই আশরাফুল এর হাত ধরেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম জয় এসেছিল। সে বছরটা আশরাফুলের কেটেছিল স্বপ্নের মত । ২০০৭ সালে প্রথম আলোর বর্ষসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছিলেন সবার প্রিয় অ্যাশ। প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে এশিয়া একাদশে জায়গা করে নিয়েছিলেন & আইপিএলেও ডাক পেয়েছিলেন একই বছরে। ২০০৮ সালে ভারতের বিদ্রোহী লীগ আইসিএলের কালো থাবায় এলোমেলো হয়ে যায় দেশের ক্রিকেট। আবারো ত্রাতার ভূমিকায় মোহাম্মদ আশরাফুল। হাবিবুল বাসার,আফতাব,নাফীস অলকরা যখন টাকার কাছে বিক্রি হয়ে যান তখন পরম মমতায় এদেশের ক্রিকেটকে আগলে রাখেন সবার প্রিয় অ্যাশ। ২০০৮ এর পর তার ব্যাটে ছিল রানখরা। দীর্ঘদিন ফর্মহীনতায় ভুগছিলেন। তবে ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে ২০১৩ সালে গলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১৯০ রানের ইনিংস খেলে আশরাফুল প্রমাণ করে দেন Form is temporary but class is permanent. গল টেস্টের সেই সুখস্মৃতি আবারো নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছিল আশরাফুল ভক্তদের। কিন্তু কে জানতে এর পরের অধ্যায়টা এমন হবে। ২০১৩ সালে বিপিএলে ম্যাচ ফিক্সিং এর অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে। "gentleman game" ক্রিকেটে আপোষের কোন জায়গা নেই। তাই এটার খেসারত দিতে হয় চড়া মূল্যে। ফিক্সিং নামক অন্ধকার জগত যেন ছো মেরে কেড়ে নিল সবার প্রিয় আশরাফুলকে। প্রথমে ৮ বছর এবং পরবর্তীতে আপিলের ভিত্তিতে ৫ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হোন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে। শুরুর গল্পটার ঠিক উল্টোটা ঘটল শেষ-বেলায়। তিনি প্রমাণ করে দিলেন রূপকথা আসলে রূপকথায় বাস্তব বড়ই কঠিন আর নির্মম। আশরাফুল কি সেদিন একা কেঁদেছিলেন? রূপকথার এই রাজপুত্রের কান্না-ভেজা চোখ অজান্তেই অশ্রুসজল করেছিল দেশের কোটি ক্রিকেট ভক্তদের।

Comments

Popular posts from this blog

যে ১০টি মুহূর্ত ধোনিকে ধোনি বানিয়েছে... ভারতীয় ক্রিকেট ধোনির মতো আর কাউকে পাবে কি?

লিটল মাস্টার শচীন। Little Master Shahin.. শচীন টেন্ডুলকারের জীবনী

সাকিবের ক্যারিয়ারের ‘১৪’ বছরে ১৪টি ঘটনা। সাকিব আল হাসান।